ছুট্টে অন্ধকার ঘরে ঢুকতেই শুভ দেখে সামনে আবছা পেঁপে, থুরি পৃথ্বীশ, কোমরে হাত দিয়ে, এইবার কিছু একটা করতেই হবে, এমন এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। আর পাশে খাটে দশাশয়ী হিমু সিংহ গর্জনে নিদ্রামগ্ন।
পৃথ্বীশ কিভাবে পেঁপে হয়েছে সেটা বোধহয় সঠিক ভাবে কারোরই জানা নাই। তবে মনে হয় এজন্য ছোটবেলায় স্কুলে টিফিনে নিয়মিত পাকা পেঁপে নিয়ে যাওয়ার কারণই প্রবল বলে সবার ধারণা। তবে ও ওই কঠিন নামের থেকে পেঁপে নামেই বন্ধু কুলে বেশী পরিচিত। তবে সে যাই হোক সে কিন্ত আদতে মুখুজ্জে বামুন। পুজাচার ও মন্ত্রোচ্চারণে বড় বড় পেশাদার বামুনকে সে অনায়াসে ঘোল খাইয়ে দিতে পারে। সে নিয়েও আরেক গল্প আছে। সে সব না হয় পরে একদিন শোনা যাবে।
তবে বন্ধু মুখে কথিত আছে, পৃথ্বীশ নাকি ধ্যান যোগে মাটি থেকে বেশ কয়েক ফুট উচ্চতায় ভেসে থাকতে পারে। কথিত থাকলেও অনেক সাধ্য সাধনার পরেও কারও কপালেই আজ অবধি সেই দিব্য দর্শন জোটেনি। তবে ও যে সব পারে এ বিশ্বাস সবার। বস্তুত ওকে ছাড়া কোনো অনুষ্ঠান ভাবাই সম্ভব নয়। ও যেন সব আড্ডায় একটা প্রাণের সঞ্চার করে দেয়। শুভকে জিজ্ঞেস করেই পৃথ্বীশ পাশের ঘরে তার যোগবলে রোগ আরোগ্য কল্পে লেগে পড়ে।
যাক, একজনকে তো অন্তত তোলা গেছে। দেখা যাক এবার হিমুকে তোলা যায় কিনা। হাতে মাত্র দেড় ঘন্টা। এই ভাবতে ভাবতে শুভ ডাকতে শুরু করল। হিমু, ওই হিমু ওঠ, বেরোতে হবে তো, ওদিকে সবাই বেরিয়ে গেল তো। কিন্ত একি রে! এ তো কোনো হেলদোলই নাই। বেগতিক দেখে শুভ এবার ওর পা দুটো ধরে সজোরে ঝাঁকিয়ে দেয়। সেই ঝাঁকুনিতে সে বিরক্তি ভরা মুখে, আলতো চোখ খুলে বলে, “আই এ্যাম নট আ মর্নিং পারসন”। ব্যাস এই বলেই আবার নাসিকা গর্জন শুরু।
ওদিকে আবার আমাদের সিধু জ্যাঠা, ঋতুকে সময়মত রাস্তায় দাঁড়াতে বলা আছে। সে তো আবার সময়ের দুই মিনিট আগে আসবে তবু পরে নয়। বেগতিক হিমুকে দেখে যে শুভ তাকে পরে বেরোতে বলবে, তার আর উপায় কই? ফোন করলে সে জানায় যে, সে তো বেরিয়ে পড়েছে। শুভ তড়িঘড়ি গরম চা বানিয়ে হিমুর কিছে গিয়ে গায়ে কাপের হাল্কা ছ্যাঁকা দিয়ে এবার হুমকির সুরেই বলে, “হিমু, এবার ওঠ, চা খা আর তৈরী হয়ে নে। সিধু জ্যাঠা কিন্ত বেরিয়ে গেছে”।
উপায় না দেখে, কোনক্রমে গাত্রোথ্যান করে হিমু চায়ে চুমুক দিয়েই ফসস করে ঠোঁটের কোনায় একটা সিগারেট জালিয়ে ভারী গলায় উত্তম বাবুর কায়দায় বলে “ওকে ফিরে যেতে বল। আবার না হয় পরে বেরোবে। আমার সময় লাগবে, এত তাড়া কিসের তোদের?”
এই বলতে বলতেই ঋতুর ফোন, আমি পৌঁছে গেছি তোরা কদ্দুর রে? আর কদ্দুর! ভাই তোকে পনেরো মিনিট মত অপেক্ষা করতে হবে। ওকে একথা বলে ঋতুর ফোন রাখতেই হিমুর পরবর্তী আবদার। ভাই আরেক কাপ চা হবে। এই শুনে পাশ থেকে পৃথ্বীশ বলে ওঠে, হিমু, এই দেখ মুখুজ্যে বামুন তোর সামনে দাঁড়িয়ে। স্নান করে বিশুদ্ধ হয়ে সদ্য পুজা করে উঠেছি। এবার কিন্ত অভিশাপ দিয়ে ভস্ম দেব, সেটা কি ভাল হবে!
এদিকে শুভ হোয়াটসঅ্যাপে দেখে সৌগত, পটল, সজল, অভ্র সবাই বেড়িয়ে পড়েছে, ওদিকে আবার ঋতুর ফোন, আমি আর তোদের অপেক্ষা করতে পারছি না ভাই। হেব্বি বোর হচ্ছি। আমি বরং তোর বাড়ির দিকেই হাঁটা দিলাম, পথে তুলে নিস। সে কি রে, শুধু শুধু হাঁটবি! বলতে বলতেই ফোনটা কেটে হিমুর দিকে কটমট করে তাকাতেই কাজ হয়ে গেল। দ্বিতীয় পেয়ালা শেষ করেই নিমেশে হিমু তৈরি।
ঘড়ির কাঁটায় প্রায় সকাল আটটা। হিমু বলে, তাতে কি, মাত্র তো এক ঘন্টাই লেট, দিন তো আর শেষ হয়ে যায়নি! অবশেষে ওরা চার জনে রওনা দিল। স্টিয়ারিং এ শুভ, পাশে এসিস্ট্যান্ট হিমু আর পিছনে পৃথ্বীশ আর মাঝ রাস্তা থেকে ওঠা ঋতু। ঠিক যেন অরণ্যের দিন রাত্রির অসীম সঞ্জয় হরি আর শেখর। বন্ধু চল। গন্তব্য ………
ক্রমশ…



