সালটা ২০০৬। বছর দুয়েক আগে কলেজ থেকে কম্পুটারে স্নাতকোত্তর শেষ করে তখন কর্মসূত্রে কেমব্রিজ শহরে। কেমব্রিজ নিয়ে বলতে বসলে গল্প শেষ হবে না। সে না হয় আরেকদিন বলব। নাগালের মধ্যে Cambridge University, মানে Kings College, Queens’ College, Trinity College, St. John’s College, Downing College. ইতিহাস ছড়ানো চারিদিকে। দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনো মনে উত্তেজনা হয়। সদ্য কলেজ থেকে পাশ করা একজনের কাছে এর থেকে ভালো জায়গা আর কি হতে পারে? এতো স্বপ্ন সত্যি হওয়ার জোগাড়। তবে এই প্রাণবন্ত শহরে থেকেও, এই ঐতিহাসিক কলেজ গুলোতে পড়তে না পেরে মনে মনে একটু আক্ষেপও হয়েছিল বটে। যাই হোক, সেকথা এখন থাক।
সময়টা নভেম্বরের প্রায় শেষ। ইংল্যান্ডে জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে বেশ কিছুদিন হল। দিনের আলো এখন মাত্র ৬-৮ ঘন্টা স্থায়ী। ভিক্টোরিয়া স্ট্রিট এর একটা কাঠের দোতলা বাড়িতে আমরা চার জন থাকি। সকলেই ভারতীয়, তবে তিন জন দক্ষিণ ভারতের। একতলায় দুটি ঘর, রান্নাঘর ও তার সাথে একটানা বসার ঘর। একটা সরু কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায়ও দুটি ঘর, আর সাথে বাথরুম। এর মধ্যে বসার ঘরটির একটা বৈশিষ্ট ছিল। তার দেয়াল ও ছাদ ছিল কাঁচের। এক দেওয়ালে দরজা, যেটা খুলতেই বাড়ির পিছনে ছোট একটা গ্যারাজ আর তার শেষে কাঠের দেওয়াল দেওয়া বাড়ির সীমানা। তবে ওই কাঠের দেওয়ালে গাড়ি বেড়োনোর জন্য বানানো দরজা বহুকাল যে খোলা হয়নি তা সহজেই দেখে বোঝা যায়। রান্নাঘরের পাশের দরজা খুলে কাঁচের দেওয়ালের পাশ দিয়েও পিছনের গ্যারাজে যাওয়া যায়। বাইরের মাটিটা ছিলো নুড়ি পাথরে ঢাকা। পরিচর্যার অভাবে প্রচুর লতাগাছে কাঠের দেওয়াল আর কাঁচের ঘর প্রায় পুরো ঢাকা। দিনের আলোও এঁকে বেঁকে বসার ঘরে আসে। তবে বৃষ্টির দিনে ওই ঘরটার একটা আলাদাই অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে দিনে ভীষণ রোমান্টিক কিন্তু রাতে তা নয়।
নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল বেশ। আমি তখন রান্না জানিনা। সাহস দেখিয়ে দায়িত্ব নিতে গিয়ে পাছে ছড়িয়ে ফেলি, তাই সব্জি কাটা আর বাসন মাজার কাজই বেছে নিলাম। দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়ে গেল। দারুন মজায় ভালোই কাটছিল দিন। অফিস থেকে বাড়ি এসে আমার কাজটা আধঘন্টায় শেষ করে ফেললেই আমার সেদিনের মত ছুটি। তারপর বসার ঘরে ল্যাপটপে সিনেমা দেখা, গান শোনা, নিখাদ আড্ডা আর সঙ্গে গরম চা, কফি বা কখনওবা beer বা wine. না, আমি কোনোদিনই ওসবের নেশা করিনি, তবে আমি একটা কথা ততদিনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে “be roman in Rome”। তবে আমাদের আড্ডা হত ইংরাজীতে! আমি জানলেও বাকিরা যে হিন্দি জানেনা। ঊফ, আমার স্কুলের ইংরাজী মাষ্টারমশাই আমাকে ওইভাবে কথা বলতে শুনলে যে কি আনন্দ পেতেন তা আর কি বলব! ওই বিষয়ে কোনোদিনই আমি ওনাকে খুশি করতে পারিনি। আমাকে মৃত্যু ভয় দেখালেও আমি কোনদিনই যে ৬০ এর বেশি পাওয়ার যোগ্যতা রাখিনা তা তিনি জানতেন! 😛 ব্যাস তারপর রাতে গরম গরম খাবার তৈরি। সবাই একসাথে dinner করে যে যার ঘরে প্রস্থান করা। এই ছিলো আমাদের রোজকার দিন। তবে সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
সেটা ছিল long weekend। শুক্রবার সন্ধ্যে বেলাই খবর এলো বিজয়ের বাবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে তাড়াতাড়ি দেশে ফিরতে হবে। আমরা তারই ব্যাবস্থাপনায় ব্যাস্ত ছিলাম। কিন্তু তা আর বেশিক্ষণ করতে হয়নি। মাঝরাতেই খবর এলো তিনি আর নেই। কাজেই তাকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় দেশে ফিরতে হবে। সময় নষ্ট না করে আমরা সবাই মিলে শনিবার ভোরেই রওনা হলাম London Heathrow র উদ্দেশ্যে। যেভাবেই হোক, ওকে আজ ব্যাঙ্গালোর পৌঁছতেই হবে। প্রায় ঘন্টা তিনেকের রাস্তা। বেলা এগারোটা নাগাদ flight এর টিকিট জোগাড় করে তাকে রওনা করে আমাদের বাড়ি ফিরতে বিকেল গড়িয়ে গেল। স্বভাবতই সকলেরই মন খারাপ। বিষন্ন মনে যে যার ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিয়ে প্রায় রাত আটটা নাগাদ কফি হাতে সবাই নিচে বসার ঘরে মিলিত হলাম। যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে, বরং ওর ঘরে একটা ধুপ জ্বালিয়ে দেই, এই সময়ে অনেক কিছু ঘটতে পারে। যে চলে গেছে তাঁর ছেলে তো এই ঘরেই থাকত! গম্ভীর ভাবে আন্না বলে উঠলো। ও প্রথম থেকেই একটু ধর্মভীরু আর একটু কুসংস্কারী। পছন্দ না হলেও আমি আর বাধা দিলাম না। ও যা করার তাই করল। আমি ততদিনে নিজের তাগিদেই কাজ চালানোর মত রাঁধুনি হয়ে উঠেছি। তাই সেদিনের রান্নার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই নিয়ে নিলাম। পরের দিন তো ছুটি, কাজেই তেমন তাড়া নেই।
বাইরে প্রায় -৩ ডিগ্রী, তার উপর বৃষ্টি। পূর্ণ ক্ষমতায় ঘরের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রক যন্ত্র চলছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে দেখলাম বাইরেটা একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। কাঁচের ঘরের ছাদে বৃষ্টির টুপটাপ আওয়াজ হচ্ছে। কিন্তু আজ আর কোন রোমান্টিজম খুঁজে পেলামনা। বরং সকাল থেকে যা যা ঘটেছে তার সাথে ওই বন্ধ ঘরে ধূপের গন্ধে আর আন্নার কথায় ওদিকে তাকালে গা টা একটু যেন ছমছমই করে উঠছে। তা ওদিকে না তাকালেই হল, এই ভেবেই রান্নায় মন দিলাম। এখন রান্নাঘরে আমি একা, বাকিরা যে যার কাজ সেরে নিজেদের ঘরে। বসার ঘরের লাইটটাও কেউ জ্বালায়নি আজ। রান্নাঘরের আলো ওই কাঁচে পড়ে প্রতিফলিত হয়ে বসার ঘরটা হাল্কা আলোর আভায় ভরে আছে। প্রায় ঘন্টাখানেক পরে দেখি রান্নার বাষ্পে ওই ঘরের দেওয়াল গুলো সব ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু জানালা খোলার যে কোন উপায় নেই। ওই ঠান্ডা হাওয়া যে ঘরে ঢুকলেই বিপদ। এই ভাবেই রান্না চালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই সেটা উপলব্ধি করে আমিও তাতেই মন দিলাম। আন্নার ঘর থেকে তামিল ভজনের আওয়াজ ভেসে এলো। বিজয়ের ঘরটা তার পাশেই। এবার কিন্তু আন্না জোর করে ভয় পাওয়ার ব্যাবস্থা করছে! এবার বোধহয় একটু বাড়াবাড়িই হচ্ছে। আমি বলা সত্বেও আন্না তা বন্ধ করতে নারাজ। আমিও আর কথা না বাড়িয়ে নিজের কাজে মন দিলাম।
আমার রান্না প্রায় শেষ। এবার ওভেন বন্ধ করে নাবিয়ে ফেললেই হয়। উফ, আজ বেশ রাত হয়ে গেলো। ঘড়িতে প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা। এবার সবাইকে ডাকা যাক এই ভেবে আন্নাকে হাঁক দিতে গিয়ে হঠাৎ বসার ঘরের দিকে নজর যেতেই আমি থমকে গেলাম। সারা শরীর দিয়ে একটা ঠান্ডা শিহরণ বয়ে গেলো। আমি কি ভুল দেখছি? নিজের চোখ কচলে আবার দেখলাম। না, ঠিকই দেখছি। কিন্তু কে লিখলো? এইতো কিছুক্ষণ আগেও কিছু ছিলোনা। তাহলে হঠাৎ ওই কাঁচের দেওয়ালে……। পরিষ্কার বাষ্পের উপর আঙ্গুল দিয়ে লেখা। দূর থেকে পরিষ্কার পড়তে পারছিনা, কিন্তু ওটা যে সদ্য লেখা সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ভয়ে চিৎকার করে হাঁক দিলাম “আন্না… আন্না…”। কোন কথা না বলে আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় ওকে দেওয়ালটা দেখালাম। আন্নাও হতভম্ব। দুজনে একসাথে ঘরে ঢুকে লাইট জ্বালিয়ে, দেওয়ালের কাছে গিয়ে লেখাটা পড়ে শিউরে উঠলাম। পরিস্কার লেখা আছে “today this is the end….”। দেখে মনে হল কাঁচা হাতের লেখা। আন্নার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। হঠাৎ ও বলে উঠল “something is wrong happening. we should lock Bijoy’s room”। আমাদের কথার আওয়াজে সতীশও নেমে এল। ওকে বলতেই দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে সেও বাকরুদ্ধ। এবার আমি সত্যিই ভয় পেলাম। আন্নাকে সমর্থন করে বললাম “do whatever you want, but we will do together”। এই বলতেই কাঁচের ছাদে ধপধপ আওয়াজ। তিন জনেই একসাথে বুঝলাম ওটা কারও পায়ের আওয়াজ। মনে হচ্ছে ছাদে কেউ হেঁটে চলে গেলো। কিন্তু কে? অন্ধকার আর ওই গাছপালার জন্য কিছু দেখারই উপায় নেই। ওই দেশে বাড়ির বাইরে কুকুর বিড়াল ঘুরে বেড়াবে সে যে ভাবাই যায়না। তার পরেই বিজয়ের ঘরের ভিতরে আওয়াজ। কেউতো নেই ওঘরে! তাহলে আওয়াজ কিসের? আমি পুরো উপায়হীন। জানিনা কি করা উচিৎ। এতদিন তো এসব বিশ্বাসই করতাম না। কি করা উচিৎ তা জানা তো দূরের কথা।
আন্নার কথা মত অনেক সাহস জুগিয়ে তিনজন মিলে এক ধাক্কায় বিজয়ের ঘরের দরজা খুলে ঢুকলাম। কই কিছুই তো নেই! তবে লাইট জ্বলছে। হয়তো বিজয়ই তাড়াহুড়োয় সকালে বন্ধ করতে ভুলে গেছে। ঘরে আবার ধূপ জ্বালানো হল। কিন্তু একি! জানালা কে খুললো? যান্ত্রিক ভাবে ঘর যতই গরম থাক কেউ এভাবে জানালা খুলে এই ঠান্ডায় থাকতেই পারে না। তিন জনই একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করতেই বুঝলাম কারও কাছেই কোন উত্তর নেই। ওই জানালা আমি বন্ধ করতে পারবোনা! শেষে সতীশ অনেক সাহস নিয়ে চেষ্টা করলেও জানালা বন্ধ হল না। অথচ আন্নার মতে সে কালই বিজয়কে দেখেছে ওই জানালা বন্ধ করতে। কোন উপায় না পেয়ে আমরা ওই ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ঘরটি লক করে দিলাম।
আন্নার কথা মত সেদিন আমরা তিন জনই দোতলায় আমার ঘরে রাত কাটালাম। রাতে বড় কোন উৎপাত হয়নি ঠিকই, কিন্তু নানা রকম আওয়াজে বার বার ঘুম ভেঙ্গেছে। শুধু একটাই অপেক্ষা, কখন সকাল হয়! কিন্তু ঠান্ডায় ইংল্যান্ডে তো সকালে সূর্য উঠতে প্রায় ৯ টা। ভয় আর ভাবনায় কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই। বিজয়ের ফোনে ঘুম ভাঙল। ও ঠিক মত পৌঁছে গেছে এবং ওদিকে শেষকৃত্য সব ঠিক ভাবে মিটে গেছে। আন্না বলল “no need to worry anymore. everything will be fine now”। দিনের আলোয় নিচে নেমে দেখি সব স্বাভাবিক। চকচকে সূর্যের আলোতে ঘরটা অনেকদিন পর এতো সুন্দর লাগছিল। আন্নার রোজকার স্বভাব মত, সকাল সকাল “ওঁ নমঃ শিবায়” স্তোত্রে যেন সেদিন সব অশুভ শক্তি দূর হয়ে গেছিল। পরে আমরা তিন জনেই গরম কফি হাতে ওই কাঁচের ঘরে বসে গতকালের ঘটনাটা অলৌকিক ভেবে ভুলে যাওয়াটাই ভালো বলে ঠিক করলাম।
কিন্তু আজও ওই দিনের কথা মনে পড়লে গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। গত সপ্তাহেই আন্নার সাথে কথা হল। বাকিদের সাথেও যোগাযোগ আছে, তবে সোসাল মিডিয়ায়। আজও বুঝতে অসুবিধা হয় যে সেদিন আন্নার ভাবনা গুলো কি আদৌ কুসংস্কার ছিল, নাকি ঘটনাটা নেহাতই অলৌকিক বলে আমার বিজ্ঞান মনস্ক ভাবনাই ঠিক বলে ধরে নিয়ে সেদিনের ঘটনাটা সম্পূর্ণ ভুলে যাবো?


