পর্ব ৩ – পথে হলো দেখা

Runion 2026
reunion 17

কী রে, পিছনে বসে ঘুমাচ্ছিস নাকি রে বলতেই শুভ গাড়ির rear view আয়নায় দেখে, চটকা ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে হিমাদ্রী ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে ভারী গলায় বলে, কই না তো? তাহলে গুহ কী বলছিল বলতো? গুহ আবার কী বলছিল, হিমাদ্রী আমতা আমতা করতেই সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। এরকম গল্পগুজব ইয়ারকি করতে করতে ওরা এগিয়ে চলে। তবে আজ সকালেই কিন্তু ও জানিয়েছে “He is not a morning person”।

গুহ ওকালতি না করলেও আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র আদালতের মানুষ। কাজেই আইনি পরামর্শ ও মন্তব্যে আমাদের কাছে ওর কদরই আলাদা। ও যে কথায় কথায় বিভিন্ন আইনি ধারার কথা বলে ওঠে, কাজেই ওকে আমাদের অনেকেই উকিল বলেই জানে ও মানে। ওই যে সেবার সিকিম যাওয়ার পথে শিলিগুড়ি স্টেশনে তো ওর কৃপাতেই তো আমরা ভিআইপি খাতির পেলাম। 

reunion 22
reunion 19

অপরদিকে জলপাইগুড়ির ছেলে হিমু একদম আড়ম্বরহীন এক খাদ্যরসিক নিপাট সাদামাটা বাঙালি। ও শুধু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারে না মাত্র। বেচারা চাকরিসূত্রে দক্ষিণে থাকলেও খাবারে বাঙ্গালিয়ানা বজায় রেখেছে পুরোদস্তুর। গতরাতে দোসা ইডলি সাম্বরের বদলে শুভর বৌয়ের হাতে তৈরি আলু পোস্ত, মোচার ঘন্ট আর ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে সেই আমেজেই মনে হয় এখনও বার বার ঘুমিয়ে পড়ছে। আর ওদিকে পেঁপে মেতে আছে অফিসের ফোনে। কোনো এক কোম্পানির সেলস-এ বড়ো এক এলাকার দায়িত্ব ওর কাঁধে। কাজেই আজও গাড়িতে ওর সব কথা শুধু ফোনে। তবে ও কথা দিয়েছে যে গন্তব্যে পৌঁছেই অফিসের ফোন বন্ধ।

আর কদ্দুর রে! হিমাদ্রী জিজ্ঞেস করতেই, শুভ ম্যাপের দিকে তাকিয়ে বলে, কোলাঘাট আর ২০ মিনিট মতো। ওদিকে পটল থুরি, শৌর্য সাগর আর সপ্তর্ষি তো পৌঁছে গেছে। পাশ থেকে গুহ বলে, ওদের থেকে জেনে নে কোন রেঁস্তোরায় ঢুকেছে, দাঁড়া আমিই ফোন করছি। এই বলে সে পটলকে ফোন লাগায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তায় সৌগতর গাড়ি টপকে শুভর গাড়ি আগে রেঁস্তোরায় পৌঁছায়।

reunion 21

পেঁপের মত শৌর্য যে কী করে পটল নামে বন্ধুমহলে খ্যাতি পেল, সেটা আজও রহস্য। তবে কথাবার্তায় পটল ডাঙার টেনিদার সাথে ওর বেশ কিছুটা সাদৃশ্য আছে বটে। এবারের রিউনিয়নের গুরুদায়িত্ব কিন্তু পটলের উপরেই। কি জানি, গন্তব্যে পৌঁছে না আবার ব্যবস্থাপনা টেনিদার কথার মতো হয়ে যায়। এসব নিয়ে হাসাহাসি হতে হতেই কী রে সব কেমন আছিস রে, কতদিন পরে বলতো, এসব বলতে বলতে সাগরের আবির্ভাব। ওর সাথে সবার সেই ৩০ বছর আগে স্কুল ছাড়ার পরে আজ প্রথম দেখা। উত্তরবঙ্গ থেকে আসা সাগর আজও একদম যেন কার্তিক ঠাকুর। সেই একই চুলের কায়দা, একই চেহারা। ওর কাছে বয়স যেন থমকে গেছে। ওকে আজও যে কেউ একবারে চিনে ফেলবে। আজও হেঁটে গেলে রাস্তায় মেয়েরা ওকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবেই। তবে সাগরের আরেকটা গুণও আছে। সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য।

reunion 14

সপ্ত আমাদের স্টাইল আইকন। এর আগে আমরা শুধু রুপালি পর্দাতে সলমন খানকেই দেখেছি গোলাপি বেগুনি কমলা প্যান্ট পরতে। তারপরই বাস্তবে আমাদের সপ্ত। ওর ব্যাগ ঘাঁটলে সাজগোজের রকমারি জিনিস পাওয়া যাবেই। ও একটু আলাদা। আজও যেমন সবাই লুচি খেলেও সপ্ত কিন্তু ব্রেড টোস্ট। সবার থেকে আলাদা একটা ব্যাপার আছে ওর মধ্যে। আমরা পৌঁছে হুল্লোড় শুরু করতেই পরের দুটো গাড়িতে আরও কয়েকজন হাজির। সল্ট অ্যান্ড পেপার স্টাইলে শান্ত স্বভাবের সৌগত। পুরো ট্রিপে ও কতবার কথা বলবে তা গুনে বলা যাবে। ও নাকি শুধু শোনে। হোয়াটসআপেও আর বাস্তবেও। 

সাথে আমাদের ক্লাসের অন্যতম ভালো ছেলে বলে পরিচিত লম্বু সেন আর ফচকে ভোলা, এদের নিয়ে আর বেশি না ঘাঁটাই ভালো। অন্যদিকে বেঁটে সজল, আমাদের ক্যাশিয়ার টেকো যশ,আমাদের সিধু জ্যাঠা ঋতু, আর প্রবাসী চয়ন। আঙুলের কর গুনে গাড়ির হিসাব করতে করতে সপ্ত বলে, এখনও তো আরেকটা গাড়ি বাকি রে। 

reunion 20

তাইতো অভ্র আর সুমনের কথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। খোঁজ নে ওরা কদ্দুর বলতে বলতেই খানিক বাদে ওরাও হাজির। সদা ব্যস্ত অভ্র কাজের ছেলে, জীবনে ছুটি বলে ওর কিছু নাই। ওর কাছে অফিস আর কাজই জীবন। যেখানে যায়, সেখানকার অফিসেই ওর কাজ থাকে।  আজও শুনলাম ওর নাকি কাঁথি অফিসে কাজ আছে। আমাদের সিধু জ্যাঠা তো ওকে দেখে বলেই ফেলল যে তোর জামার ক্যাপশনই তো জানান দিচ্ছে রে যে তুই কতটা কাজের মানুষ।

ওদিকে সুমন চাটুয্যে আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়। ৩০ বছরে চুলে পাক ও মুখে বয়সের ছাপ পরলেও, ওকে কিন্তু আজও খাতা ভরে অঙ্ক দিলে মনে হয় কাগজ কলম মনোযোগে নিয়ে বসে যাবে।

reunion 7

যাক সবাই হাজির, একদল বাঙালিকে এবার পেট ভরে লুচি আলুরদম চা খেয়ে আরও এগিয়ে যেতে হবে। এখানে তো মাত্র অর্ধেক জনতা। বাকি একদল মাস্টার আর প্রফেসর তো আসানসোল থেকে ট্রেনে ও গাড়িতে রওনা হয়েছে। যাদের মেসেজে শুভ সকাল থেকে বেরোতে হবে বলে উত্তেজিত হয়ে আছে। হোয়াটসঅ্যাপের খবর অনুযায়ী, ওরাও ট্রেন থেকে নেমে এখন মেদিনীপুরে জলখাবার খেতে ব্যস্ত। তারপরে ওরা আবার গাড়ি নেবে গন্তব্যের উদ্দেশ্য। তোরা এখানেই ১১টা বাজিয়ে দিলি, ওরা আগে পৌঁছে যাবে তো, তাড়াতাড়ি চল, আমরা আগে ঢুকব কিন্তু। সপ্ত এসব বলতেই শুভ বলে, তুই আমার গাড়িতে বস আর শুধু কখন পৌঁছাতে হবে বলে দে। বাকিটা আমি দেখে নিচ্ছি। জোড়ে গাড়ি চলানো নিয়ে শুভকে কিছু বলা হলে কাঁচুমাচু হয়ে বলে, জোড়ে সবাই চালায় আর যত বদনাম শুধু তার। অথচ তোর গাড়িই তো সবচেয়ে পুরানো তাই না? হিমু এটা বলতেই এবার শুভ কলার তুলে বলে, তাহলেই ভাব, শুধু দোষ দিলে হবে? তোরা চালাতে পারিস না বল। সবসময় মনে রাখবি, it’s not about the plane, it’s about the pilot। আর এটা শুনে সবাই হো হো করে ওঠে।

ওরে এবার তো চল, সপ্ত আবার তাড়া দেয়। সবাই মিলে একটা গ্রুফি নিয়ে গ্রুপে দে, তারপরে চল। সেই তো, আজকাল সেলফি থুরি এখানে তো আবার গ্রুফি, সেটা না শেয়ার করলে তো সমাজে পিছিয়ে পরতে হবে। সে সব মিটিয়ে, জলখাবার সেরে ওরা সবাই আবার রওনা দিল। আর মাত্র ঘণ্টা তিনেকের পথ, তারপরেই সেই বহুপ্রতীক্ষিত মুহূর্ত। তাহলে যাওয়া যাক…

ক্রমশ…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top