“Neighbour’s envy, owner’s pride” মনে আছে নিশ্চয়ই, নব্বই এর দশকে এই tagline ছিল এক উদ্ভাবনী বিজ্ঞাপনের। সেদিন একটা খবর পড়ে সেই লাইনটার কাছাকাছি একটি প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পেলাম। এখন তো আমরা সোসাল মিডিয়ার সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে পড়েছি। কোন বিশেষ ঘটনার অপেক্ষার দরকার নেই, যা হোক একটা কিছু share করতে হবে, এটাই এখন priority. আর এই মাধ্যমে আমাদের স্বাধীন চিন্তাধারা বা প্রতিভা যেমন সকলের সামনে রাখা যায়, তেমনই সহজেই প্রকাশ্যে সমালোচনাও করা যায়। অথচ আজ এই নিছক ভাবনা প্রকাশের মাধ্যমটিতে আমরা অজান্তেই আমাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তও প্রকাশ্যে এনে ফেলি, আর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি যে কত জন আমার এই মুহূর্ত টা পছন্দ করল বা সেটা সম্পর্কে তার নিজের মন্তব্য দিল। এতে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা বিসর্জন গেলেও কেইবা তাতে পাত্তা দেয়? আমাদের মানসিকতা তো অত পরিণতই হয়নি, বরং দিনে দিনে এটা একটা নেশায় পরিণত হয়েছে। আমরা সবাই তা সম্পূর্ণ উপলব্ধি করলেও, এর ঘোরে থাকতেই বেশি পছন্দ করি। এটাই তো নেশা, তাইনা!!!
এবার বলি আসল খবরটা কি! এই ব্যক্তিগত মুহূর্ত বার বার প্রকাশ করতে করতে আসলে আমরা পরোক্ষ ভাবে তথাকথিত এক অদৃশ্য মাপকাঠিতে নিজেদের সাফল্যরই একটা প্রতিফলন প্রকাশ করতে থাকি। যেমন ধরুন, আমি কোথায় কিভাবে যাচ্ছি, আমি কোথায় কি খাচ্ছি, আমি আমার বন্ধু বা বান্ধবীর সাথে কতটা ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত কাটাচ্ছি, আমি কার সাথে কোথায় কি সিনেমা দেখছি , এমনকি আমি কি রকম নেশা করছি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সবকিছুতেই মধ্যমণি কিন্তু “আমি”! উদ্দেশ্য একটাই, আমার আমিত্ব জাহির করা আর বন্ধুদের মন্তব্য শোনা। অথচ আমি নিশ্চিত যে আমার upload করা শতাধিক ছবির এক শতাংশও বেশি কেউ দেখেনা বা আমার দশ লাইনের বেশি বড় ভাবনাও খুব বেশি কেউ পুরোটা পড়েনা!!! তাও আমি এটা করি, কারন আমি যে এই অদ্ভুত নেশায় আশক্ত। আর আসল খবরটা হল, আমাদের এই নেশার কবলে পড়ে নাকি আমাদের বন্ধুরাই মানসিক বিষন্নতায় ভুগছে।
ধুর, এ আবার সত্যি নাকি? ভুল ভাল যত সব আজগুবি খবর! পৃথিবীতে একদল লোকের সত্যিই কোন কাজ নেই, তারাই এই সব আজগুবি বিষয়ে গবেষণা করে আর খবরে তা প্রকাশ করে। বিশ্বাস করুন, আমিও ঠিক এটাই ভেবেছিলাম। ভুল ভাঙল আমারই এক বন্ধুর আচমকা এক সোসাল মিডিয়ার থেকে বিদায় নেওয়ায়। পরে তার সাথে কথা বলে তো আমি হতবাক! সে নাকি তার বন্ধুদের post দেখে মানসিক অবসাদে ভুগছে আর এর থেকে মুক্তি পেতেই তার এই সিদ্ধান্ত। তাহলে তো ওই খবরটা সত্যি, আর সেই গবেষণাও পুরোপুরি সঠিক! আমি সত্যিই অবাক!!!
অন্যের সাফল্যে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে উদযাপন করা আর নিজের সাফল্য তাড়িয়ে উপভোগ করা উচিৎ, তাই তো জানতাম। এখানে আবার বিষন্নতা কোথায়? ভাবতে লাগলাম। একটু ভাবতেই ব্যাপারটা জলের মত পরিস্কার হয়ে গেল। অন্যের সাফল্যের খবরে তো আমিও কখনো কখনো ভাবি যে ওরকম কাজ আমি করতে পারলে বেশ হতো। কিন্তু কই তাতে তো কখনো বিষাদ বা আক্ষেপ হয়নি। সে তো আমি আমার পাইলট বন্ধুর সাথে কথা বলেও ভাবতাম, ভাবতাম কি, এখনো ভাবি “যদি আমি ওর মত প্লেন ওড়াতে পারতাম”, আবার কখনো ভাবি ডাক্তার বন্ধুর মত ডাক্তার হতে পারতাম বা ওই গায়ক বন্ধুর মত গাইতে বা বাজাতে পারতাম! এরকম না জানি আরও কত কি করতে পারলে কি ভালই না হত! হয়তো আমাকে নিয়েও অনেকেই সেকথা ভাবে!!! তাতে তো কোন দোষ নেই। শুধু নিজে মানসিক ভাবে আর চিন্তা ভাবনায় একটু পরিণত হতে হবে। আত্মবিশ্বাসী থাকতে হবে। তা না হলেই যে শুধুই বিষন্নতা। আসলে আমাদের মধ্যে অনেকেই সর্বদা অবচেতন ভাবে অন্যের পোস্ট দেখে এক অদ্ভূত জটিল অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠার তুলনায় চলে যাই, যা আসলে আমাদের সঙ্কীর্ণ ও অপরিণত মানসিকতারই প্রতিফলন। বন্ধুত্বের মাঝে তো এরকম ভাবনার কোন স্থানই হতে পারেনা, তাইনা? এত বড় বড় কথা বললেই তো হল না, কজনই বা এমন ভাবতে পারে, এটাই মনে হচ্ছে তো? কিন্তু ভেবে দেখো, যারা এমন পরিণত ভাবনা পোষণ করে, তারাই আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিজগুণে সফল আর আধুনিক। এতে ব্যক্তিগত আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠার কোন সম্পর্কই নেই। আমি তো মনে করি যে আমরা যা করতে পারিনি তা আমাদের অদক্ষতার জন্য নয়, বরং আমরা নিজেরাই সেটা কখনো করতে চাইনি, আর যেটা আমি করতে চাইনি তা নিয়ে আক্ষেপ বা বিষন্নতা তো বোকামো, তাই না? এমনকি আমাদের অনেকেতো জানিই না যে আমরা নিজেরা আসলে কি চাই! কাজেই সবার আগে আমাদের মানসিকতার বিবর্তন প্রয়োজন, তারপরে বাকি সব। নিজের দৃষ্টি ভঙ্গি সময়োপযোগী ও পরিণত করে তোলাই তো নিজে আধুনিক হয়ে ওঠার প্রথম পদক্ষেপ।
আখেরে সার কথা সেই একটাই, যেটা আমিও পুরোপুরি বিশ্বাস করি, 3 idiots এর সেই basic message “run for the Excellence, success will automatically follow you…” (শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করো, সাফল্য নিজে থেকেই ধরা দেবে!).


