পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মত গত রাতের শেষ মুহুর্তটুকুও নিংড়ে নিয়ে আড্ডার পরে ওদের শুতে যেতে বেশ রাতই হয়েছিল। বিছানায় শুয়ে ঘরের সহবাসী গুহর সাথে কথা বলতে বলতে শুভর মনে হয় যদি সময়টা এখানেই থেমে যেত! আটকে থাকা যেত এই মুহুর্তগুলির মধ্যেই! আনন্দ, বাল্যবন্ধুদের স্মৃতিচারণ খুনসুটি ও আবিমৃষ্যকারিতার মধ্যে। এসব আকাশ কুসুম ভাবনা ভাবতে ভাবতেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। তবে সে যত রাতেই ঘুমাতে যাক, অভ্যাসবশতই ভোরের আলো ফুটতেই শুভর ঘুম ভাঙে। তবে জানালায় সকালের আলো আজ আর গতকালের মত সেই আনন্দ উত্তেজনা নিয়ে এলনা। আজ বিছানা থেকে উঠতেই ইচ্ছে করছে না শুভর। ঘুম ভাঙ্গার পরেও স্বভাব বিরুদ্ধ ভঙ্গিতে সে একরকম জোর করেই বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকে। তখনই দরজায় টোকা আর বাইরে থেকে আওয়াজ এল “কি রে উঠেছিস নাকি?”। সৌরেন্দ্রর গলা বুঝতে পেরে হাত দিয়ে বিছানার পাশের টেবিল থেকে মোবাইলটা টেনে শুভ দেখে তখন প্রায় সকাল ছটা। ‘একটু পরে আসছি’- বলে হাত বাড়িয়ে এসির রিমোট দিয়ে ঘরের তাপমাত্রা আরও দুই ডিগ্রি কমিয়ে সে তার স্বভাববিরুদ্ধ ভঙ্গিতে ওপাশ ফিরে আবার শুয়ে পড়ে। কিছুই যেন ভাল লাগছে না আজ। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে অবশেষে বিছানা ছেড়ে উঠে পরে। পাশে উকিল তখনও ঘুমে অচৈতন্য।
তৈরী হয়ে বাইরে বারান্দায় বেরোতেই দেখে নিচে চায়ের কাপ হাতে কয়েকজন গল্পে মশগুল। প্রচণ্ড হাত পা নেড়ে যশ কিছু একটা ব্যাখ্যায় ব্যাস্ত। উৎসুক হয়ে কালক্ষেপ না করে নিচে যেতেই সে বোঝে যে সবাই পরেরবারে রিইউনিয়নের জায়গা কি হতে পারে সেই আলোচনায় ব্যাস্ত।
‘এতদিনের প্ল্যানিং আর ভাবনা চিন্তার পরে তাহলে এবারেরটা শেষ হয়েই গেল’- সৌমেন একথা বলতেই পাশ থেকে আমরি বলে, “আরে শেষ না হলে পরের বারেরটা করবি কি করে বল দেখি”? আরেক কাপ চা বল দেখি, তাহলে কি ঠিক হল, পাহাড় সাগর নাকি জঙ্গল? এই বলতে বলতে শুভও ওদের আলোচনায় যোগ দেয়।
সাগর জানায় লাটাগুড়িতে করলে ও একটা ব্যাবস্থা করে দিতে পারবে। ‘তাহলে পরেরবার উত্তর বঙ্গেই হোক, নাকি?’-শুভ একথা বলতেই সৌরেন্দ্র বলে “আমার কোন আপত্তি নাই, তবে আমি বলি কি, কাছাকাছি হলে বেশী লোকজন আসবে, তাই না?”।
পাশ থেকে সৌগত বলে ‘সেই তো, আমাদের এই রিউনিওন তো অনেকটা অলিম্পিকের মত, যেখানে জায়গার মাহাত্ম্যর থেকেও সবার অংশগ্রহণ করাটাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ’। খুব গম্ভীর ভাবে বললেও এটা শুনেই ওরা সবাই হো হো করে ওঠে।
এমন সব আড্ডার মাঝে হঠাতই আমরি বলে,’আচ্ছা এবারে বাবা পৃথ্বিশের অলৌকিক মহিমা দেখেছিস কি কেউ? ও কি উঠেছে?’ -বলতেই জয়ন্ত হাত তুলে পুলের দিকে ইশারা করে বলে ‘ওই দেখ, বাবা জলে।’ সেকি! সবাই ওদিকে তাকাতেই দেখে পেঁপে সকাল সকাল পুলে দিব্য সাঁতারে ব্যাস্ত। আমরি অবাক হয়ে বলে আমরা তো এখানেই বসে আছি, তাহলে ও কখন নামল? একেই বলে বাবার মায়া, দিব্য দর্শন না হলে কি হবে, বাবার দিব্য লীলা তো দেখতে সবাই পেলি, এটাই বা কম কি!
“চল এবার,স্নান করে ব্যাগ গুছিয়ে নিতে হবে তো। ব্রেকফাস্ট করেই বেড়িয়ে যাব। লাঞ্চের আগে কলকাতা ঢুকতে হবে কিন্তু।”- সৌমিত্র একথা বলতেই ‘চল চল’ করে একে একে সব উঠে পরে। তবে আসানসোলের জনতার ট্রেন দুপরের দিকে, ফলে ওদের অত তাড়া নাই।
বরং ওদের কপালে ঈর্ষনীয় কিছুটা অতিরিক্ত বোনাস সময় জুটেছে, ঠিক সব খাওয়ার পরে পাওয়া সেই ফাউ ফুচকার মত। ‘তোরা সব তৈরী হয়ে নে, আমরা আসছি’- বলে ড্রাইভারের দল তাদের বাহন পরিষ্কার ও খুঁটিনাটি একবার দেখে নিতে চলে যায়। অনেকটা পথ চালাতে হবে যে ওদের। এ যেন একেবারে রকেট উৎক্ষেপণের আগের চেকিং।
অবশেষে বিদায়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসন্ন। এ’বছরের মত অধিবেশনের যবনিকা পতন। অনেকের সাথেই পরের বছরের আগে হয়তো আর দেখাই হবে না। গাড়ীতে ওঠার আগে শুভ পটলকে জানায় যে “কাঁথি পেরিয়ে সবাই মিলে ডাব খেতে একবার দাঁড়াব কিন্তু”। আসার সময় তো পেটে লুচি ঠাসা ছিল বলে ইচ্ছে থাকলেও দাঁড়াতে পারিনি।
বিদায়বেলার কিছু মুহুর্ত ক্যামেরা বন্দি করে সবাই সবাইকে বন্ধুত্বের শুভেচ্ছা জানিয়ে ওরা গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে। কনভয়ের মত সার দিয়ে গাড়ি গুলি বেরিয়ে পরে। বেরোনোর বেলায় শুভ হাত নেড়ে সবাইকে মনে করিয়ে দেয় যে পরের বারের জায়গা ও পরিকল্পনা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হবে কিন্তু। পরের বছর আবার দেখা হবে…
…সমাপ্ত



