বন্ধুরা সবাই জানে যে শুভর রাত জাগার অভ্যেস নাই। স্কুলে পড়তে ইংরেজিতে Idioms পড়তে গিয়ে “Burning Midnight Oil” কথাটা পড়লেও মনে হয় ওটা কোনোদিন অনুভব করা হয়নি ওর। ওর চোখ দেখে রাতের আড্ডার মাঝেই জয়ন্ত ওকে ঘুমাতে যেতে বলে। হিমুর বিপরীতে শুভ হল যাকে বলে একেবারে Morning Person. বাকিদের অধিকাংশই আজকালকার করপোরেট জীবনশৈলীতে অভ্যস্ত। কাজেই তারা অনেকটা রাত জাগে, সকালে দেরিতে ওঠাতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে। আজ শুভ আর গুহর এক ঘরে সহবাস। স্কুলে পড়তে ওরা একই পাড়াতে থাকত। কাজেই ওদের ছোটোবেলার একসাথে অনেক স্মৃতি। কত খেলা কত ঘটনা। তবে ইদানীং উকিল বাবুর শরীরটা একটু বেশিই বেগড়বাঁই করে চলেছে আর সেজন্য সে একটু বেশিই সাবধানী। সে যাই হোক, রাতে ঘরে শুভর সাথে নানান স্মৃতিচারণের মধ্যে কখন যে শুভ ঘুমিয়ে পড়েছে ওর মনে নাই। রাতে গল্পগুজব করে একটু দেরিতে শুতে গেলেও সকালে চোখ খুলে হাতড়ে পাশের টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে শুভ দেখে এখনও ছটা বাজতে খানিক বাকি। পাশে গুহ বেশ সুরেলা ছন্দে আওয়াজ সহকারে নিদ্রামগ্ন। ঘুমের পরে চনমনে মেজাজে স্বভাবজাত ভাবেই এক লাফে বিছানা থেকে উঠে ব্রাশ করতে করতে ভাবতে থাকে এত সকালে আর কে কে উঠতে পারে! আরে, রোজ সকালে ওদের বন্ধু গ্রুপে প্রথম “Good Morning Friends” মেসেজটা তো মাস্টারই পাঠায়। তাহলে এতক্ষণে ও নিশ্চয়ই উঠে গেছে, ওর ঘরেই সকালের চা টা খেয়ে আসি। এই ভেবে সে ধীর গতিতে ঘরের বাইরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়, পাছে উকিল বাবুর ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু বারান্দায় এদিক ওদিক তাকাতেই দুদিকেই তো পর পর ঘর। রুম নম্বরটা তো জানা হয়নি, তাহলে কোন ঘরে সৌরেন্দ্র? এখন কি করি?
সব ঘরেই তো আমাদেরই লোকজন। কাজেই গিয়ে একবার করে দরজায় বরং ঠকঠক করি? জেগে থাকলে নিশ্চয়ই আওয়াজ দেবে। যেমন ভাবনা তেমনই কাজ। দ্বিতীয় বা তৃতীয় ঘরে যেতেই ভিতর থেকে আওয়াজ আসে “আয়”। সে যেন শুভরই অপেক্ষায় ছিল। দরজা খুলে ঢুকতেই সৌরেন্দ্র বলে চল একটু পায়চারি করে আসি। ওর অমৃতাংশুর সাথে সহবাস ছিল। সেও তৈরি। কিন্তু চা? পাশের ঘরেই প্রফেসর সৌমেন আর জয়ন্তও উঠে গেছে। ওরা চা বানাচ্ছে। সৌরেন্দ্র নিজে চা না খেলেও চায়ের খবর রাখে দেখছি। এত সকালে প্রফেসর চা বানাচ্ছে! ওরা নিশ্চয়ই চা বানাতে বানাতে এন্ট্রপি জাতীয় কিছু নিয়ে আলোচনা করেছে, এই ভাবতে ভাবতে শুভ এক ছুট্টে ওদের ঘরে গিয়ে জানায় – এন্ট্রপির এলোমেলো তাপে আমারও এক কাপ।
চায়ের কাপ হাতে সুপ্রভাতী আড্ডায় “বাকিরা কই রে?” বলতেই একে একে পটল, পেঁপে, চিমড়ে, ব্যাঁকা, বেঁটে, গেঁড়ি সবাই হাজির। সুমন্তও কলকাতা থেকে বাসে রওনা হয়েছে, একটু পরেই চলে আসবে। চিমড়ে থুড়ি নিলাদ্রী রেলের কর্মচারী। রেলে সফর করার সময় ও যদি সাথে থাকে তাহলে সফরের আপ্যায়ন আলাদাই মাত্রা পায়। রেলের একটা কেউকেটা হলেও আজ অবধি বন্ধুদের কেউ কিন্তু ওর থেকে একটিও ট্রেনের টিকিট বার করতে পারেনি। গড়নে ছিপছিপের থেকে একটু কম, কথায় অত্যন্ত চটপটে, কাজে ভীষণ হিসেবি আর স্বভাবে বন্ধুদের কথার মাঝে ফোড়ন কাটা। একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সাসপেন্স বজায় রেখে কাজ করা ওর স্বভাব। যেমন ওদের প্রথম রিউনিওনে আসব আসব করে বাইক নিয়ে মাঝ রাতে উপস্থিত হয়েছিল। তবে ওর উপস্থিতি আড্ডায় অন্য ডেসিবেলের এক মাত্রা যোগ করে।
যা, আজও আমাদের বাবা পৃথ্বীশের যোগবলে আকাশে ভেসে থাকা দেখা হল না যে, বলে মজা মশকরা করতে করতে সৌমিত্র গম্ভীর গলায় বলে, আজকের প্ল্যান কি? বলতেই পেঁপের তার অনন্য ভঙ্গিমায় উত্তর “আজ শুধু হুল্লোড়, জলখাবার খেয়েই সবাই পুলে। আপাতত এটুকুই। তারপরের প্ল্যান পরে হবে”। পুলে বললেই হল, সাঁতার জানে না আবার পুলে, চিমড়ে পাশ থেকে ফোড়ন কাটতেই আত্মসম্মানে আঘাত খেয়ে পেঁপে বলে গ্রামের পুকুরে স্নান করি রে, চল তোকে আজই শিখিয়ে দেব। ব্যাস হয়ে গেল, বামুন পৃথ্বীশ যখন বলেছে আজ তো সবাইকে সাঁতার শিখতেই হবে। একে একে ওরা সবাই পুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
হিমু মর্নিং পারসন নয়, গুহর ঠান্ডা লাগার ধাত, কৌস্তভ কথা দিয়েছে ঘুম থেকে উঠলেই চলে আসবে আর সৌগতর দাঁতে ব্যাথা। কাজেই আজ এই সাঁতার প্রতিযোগিতায় ওদের দায়িত্ব ছবি তোলার। কিছু না করে কেউ থাকতে পারবে না, বামুনের আদেশ। সদলবলে নানান কায়দায় জল ক্রীড়ার নানান মুহুর্ত ক্যামেরা বন্দী করে শেষে পেঁপে তার সাঁতারু প্রতিভা সদর্পে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করে।
তা কেউ সাঁতার জানুক বা না জানুক আজ সবাই জলে যেন কোনি, ওদের পারতেই হবে। তবে পুলে সিধু জ্যাঠার অধ্যাবসায় দেখার মত ছিল। পৃথ্বীশের একমাত্র যোগ্য ছাত্র যে পুরো সময়টা অক্লান্ত ভাবে পেটে টিউব সেঁটে সাঁতার শেখার চেষ্টা করে গেল।
জল থেকে উঠে স্নান করে ফ্রেশ হতেই আবার একই প্রশ্ন, তাহলে এবার কি? দীঘা? ওতে আমি নাই জানিয়ে দেয় লম্বু সেনি। গতকাল অনেক ধকল গেছে, আমার একটু মাসাজ প্রয়োজন। সে জানায় সব ব্যবস্থা পাকা, এখুনি একজন আসবে ওর হাত পা টিপে দেওয়ার জন্য। তোর এই আয়েশের কথা তো জানা ছিল না বন্ধু, ভুরু তুলে সেনিকে বলে সজল। তার আগেই সেনি চয়নকে দীঘার কোন এক বিশেষ দোকানের গুড় আনার আবদার রেখে দোকানের বিবরণ দেয়। তারপর মাসাজের কথা শুনে চয়ন পাশ থেকে বলে, বাঃ গুরু, তুমি মাসাজ নেবে আর আমি তোমার জন্য ঘুরে ঘুরে গুড় কিনব! আহা, ওরকম ভাবছিস কেন, বাল্যবন্ধুর জন্য এটুকু করতে পারবি না? হো হো করে হেসে ওঠে ওরা।
তবে দীঘার কথায় বাকিরা একেবারে একপায়ে খাড়া। সবাই সমস্বরে বলে let’s go। সৌগত একেই কথা কম বলে, তার উপর ওর দাঁতে ব্যাথা, সেও ব্যথায় চাপা গলায় জানায় দাঁতে দাঁত চেপে আজ দিঘা যাবে। যেমন বলা তেমন কাজ। ভিআইপি কনভয়ের মত পাঁচটা গাড়ি বেড়িয়ে পড়ে রাস্তায়। মেরিন ড্রাইভ ধরে এগিয়ে দিঘার সমুদ্র সৈকত, মোহনা, মন্দির সব ঘুরে বিকালে ফেরে ওরা। ফিরতেই প্রশ্ন, ভাই আজও সন্ধ্যার আড্ডাটা আছে তো? হাত তুলে “সব আছে” জানিয়ে অভয় বাণী পটলের। কিন্তু সপ্তর চিন্তা একটাই, দিন তো চলে গেল, মটনটা হবে তো? সেই পরিকল্পনার সময় থেকে ওর আবদার মটনের। কত বোঝানো হল, সমুদ্রের ধারে মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি এসব খেতে হয়, কিন্তু ও আটকে আছে সেই মটনে। আচ্ছা বেশ তাই হবে, আজ রাতেই মাংস হবে। পটলের মুখে এটা শুনেই গেঁড়ির চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। সেই আনন্দে আর সাগরের অনুপ্রেরণায় সে তো সান্ধ্য আড্ডায় দুটো গানও গেয়ে ফেলে।
সন্ধ্যা সাতটা বাজতেই আবার সবাই হাজির আড্ডা ঘরে। আজই শেষ দিন, চেটেপুটে নিতে হবে সবখানি মুহূর্ত। স্ন্যাক্স আর ঠান্ডা পানীয়র সাথে আবার গান, কবিতা, স্মৃতিচারণ ও আড্ডা। আবার একটা ফ্ল্যাশব্যাক সেই মিশনের খাকি হাফপ্যান্ট পড়া কতগুলি ছেলে ছোকড়ার। ক্লাসের পড়ার মাঝে খুনসুটি, মহারাজদের অনুশাসন, স্যারেদের বকুনি, একসাথে কান ধরে নীলডাউন, প্রেয়ার লাইনে বেতের ঠ্যাঙানি, টিফিনে এক ছুটে গিয়ে আইসক্রিম খাওয়া, স্পোর্টসের সময় ফুটবল খেলা আর ছুটির ঘণ্টার ছুট। ছুঁয়ে ফেরার চেষ্টা সেই মুহূর্তগুলি, তবু যেন বাকি রয়ে গেল অনেক স্মৃতি। এবছরের রিউনিওন তো শেষ বেলায়, তাহলে এবার সবার একটা ছবি হয়ে যাক!
সময় বহমান। নিখাদ আড্ডার শেষে আবদার মেটানো মটন সহকারে রাতের খাবারও শেষ। আর বাকি মাত্র কিছু ঘণ্টা। অবশেষে আরেকটি দিনের অবসান। ওদের স্কুল ছাড়ার ৩০ বছর পার। সময়ের সাথে বয়সের প্রভাবও পড়েছে। এখন আর শরীর ছোটোবেলার মত অত বয় না। আবার কাল সকালে দেখা হবে, এখন ঘরে গেলাম রে। ক্লান্ত শরীরে একে একে সবাই নিজের ঘরে যায়। এই মুহূর্তের জন্য এত প্রতীক্ষার পরেও পার হয়ে যায় আরেকটা দিন। আবার দেখা হবে কাল সকালে বিদায় বেলায়…
ক্রমশ…



