পর্ব ৪ – পুণর্মিলন

reunion 13

তবে মনে হচ্ছে আর শেষরক্ষা আর হল না। সরু মোটা আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে এগিয়ে চলতে চলতে ভাবতে থাকে শুভ। অবশেষে ওরা সবাই তাজপুরে সেই গন্তব্যের কাছে। বর্ষার রাস্তায় সন্তর্পণে খানাখন্দ পেরিয়ে গাড়ি সামলে অবশেষে হোটেল চত্বরে প্রবেশ। ওভাবে “মাসিমা, মালপো খামু” ভঙ্গিতে সবাই যদি রাস্তায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে মালপোয়া খেতে শুরু করে, তাহলে কি আর সবার আগে পৌঁছানো যায়? তার উপর তুই তো আর আমার গাড়িতে এলি না। এখন আর ওসব বলে কি হবে? সবার আগে পৌঁছাতে না পেরে গাড়ি পার্কিংয়ের সময় সেই নিয়ে গজগজ করতে থাকে সপ্ত আর শুভ। তবে ভোলার বউয়ের হাতে তৈরি মালপোয়া কিন্তু পুরো হিট। শুরুতেই মিষ্টি মুখ করে বৌদি আমাদের পুরো রিইউনিয়নের মেজাজটাই যেন আজ মিষ্টি করে দিয়েছে। “ঠিক আছে, ছাড় ওসব” বলে দুজনেই হেসে ফেলে সামনে তাকাতেই একদল মাস্টারমশাই। ওই তো লম্বা সৌরেন্দ্র, কিরে দেখতো উপরের আবহাওয়া কেমন, আজ আর বৃষ্টি হবে না তো? বলতে বলতে সবাই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। কতদিন পরে দেখা সবার সাথে। পাশেই আরেক মাস্টার জয়ন্ত আর ফিজিক্সের অধ্যাপক সৌমেন, সাথে রেলের রোগা নীলু। কিছুক্ষণ পরেই গাড়িতে আমাদের ব্যাংকার দেবরাজ আর ব্যবসায়ী কৌস্তুভ হাজির। শুধু বিকেলে অমৃতাংশু (আমরি) আর কাল সকালে সুমন্ত আসবে। তবে এবারে আমরা প্রায় এক্কেবারে যাকে বলে ফুল হাউস।

reunion 11

তুই কিন্তু মোটা হয়ে গেছিস, নিজেকে এমন তরতাজা রেখেছিস কি ভাবে ভাই, তুই তো একদম বুড়ো হয়ে গেছিস, এখনও কী চেহারা রে তোর, তুই এখন কোথায় আছিস রে এসব নানান কথাবার্তা চলতে থাকে ওদের মধ্যে। নাঃ, আমাদের পটল খাসা জায়গার বন্দোবস্ত করেছে। এদিক ওদিক করতে করতে সবাই নিজের ঘরের পার্টনার জোগাড় করে থিতু হয়ে গেছে। নানান ভঙ্গিতে ছবি তোলা ও খুনসুটি চলছে।

একে তো এতদিন পরে দেখা, তার উপর এরা সব স্কুলের বন্ধু। মানে সেই ক্লাস ওয়ান থেকে। এক্কেবারে হৃদয়ের সম্পর্ক বলতে যা বোঝায়। এদের সাথে যা খুশি বলা যায়, যেমন খুশি থাক যায়, এটাই তো বাল্যবন্ধুত্বর মজা। এখানে রাম বাম, রাগ হিংসা, ঘৃণা ভয় এসবের কোনো জায়গাই নাই। শুধু নিখাদ আনন্দ আর মজা, এক ছুট্টে যেন ছোটোবেলার স্কুলের দিনগুলিকে ছুঁয়ে ফেরার চেষ্টা, হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলিকে আরেকবার জীবন্ত করে তোলা। এই মুহূর্তের রসদই যেন এদের সারা বছর বেঁচে থাকতে শেখায়। আর রেখে যায় এক নেশা, যার টানে এরা ফি-বছর এই দিনটার জন্য ছুটে আসে দেশ তথা বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে।

কই রে, আমাদের জার্সি কোথায়? প্রতি বছরের মত এবারেও ডিজাইনের দায়িত্ব শুভর হলেও এ বছর ছাপানোর দায়িত্ব ছিল ভোলার উপর। এক বস্তা টিশার্ট নিয়ে স্কুলের মতো রোল কল করতে শুরু করে ভোলা। লম্বা মাস্টার, প্রফেসর, পেঁপে, পটল, বেঁটে … শুরু হয় বিতরণ। এ যেন একেবারে স্কুলের মাঠে স্পোর্টসের পরে পুরস্কার বিতরণ। মুহূর্তের মধ্যে সবার একই জামা, যেন এবার একসাথে মাঠে নেমে পড়লেই হয় আর কি। লাঞ্চ সেরে সবাই মিলে একবার সমুদ্রের ধার থেকে ঘুরে এসে দুপুরে কয়েক ঘন্টার রেস্ট। এক্কেবারে নিস্তব্ধ চারিদিক, সকাল থেকে অনেক ধকল গেছে সবার। এবারে একটু বিশ্রাম প্রয়োজন। বিকেলে তো আবার আড্ডা। বিকেলের চায়ের আমন্ত্রণের ডাকে ঘুম ভাঙে ওদের। দেখে ততক্ষণে টিশার্টে আমরিও হাজির। তাহলে সন্ধ্যায় কী হবে রে? কোথায় বসবি সবাই? একটা ভালো জায়গার ব্যবস্থা কর। এসব বলতেই শৌর্য জানায়, ঘর প্রস্তুত। আমাদের জন্য নাকি একটা আলাদা আড্ডার ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবাইকে সাতটা নাগাদ হাজির হতে হবে।

reunion 9

বিকেলের চা খেয়ে, ফ্রেশ হয়ে ঘড়ির কাঁটায় সাতটা বাজতেই সবাই হাজির। একটা বিশাল ঘর, মাঝে বড়ো টেবিল। সম্ভবত ওটা হোটেলের মিটিং রুম। কেউ কখনও ভেবেছে এমন মিটিং রুমে কেউ কখনও আড্ডা দেবে বলে? সে যাই হোক, কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিল ভরে গেল মাছ, চিকেন আর সবজির সুস্বাদু স্ন্যাক্সে, তাও আবার নাকি আনলিমিটেড। সাথে ঠান্ডা পানীয়। আহা, শৌর্য কিন্তু ব্যবস্থাপনায় এক্কেবারে “ক” পেয়ে পাশ করেছে। রয়েবসে আড্ডা বেশ জমে উঠেছে। তখনই আরেকটা আবদার।

একটা মাইক আর সাউন্ডবক্স হবে ভাই। আবার সবাই পটলের শরণাপন্ন। যেমন বলা তেমনি কাজ, মুহূর্তের মধ্যে সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। কিন্তু এতে হবে কী? তখনই শোনা গেল “হেলো, চেক চেক”। সাগরের গলা না। ও হ্যাঁ, ওর তো আরেকটা প্রতিভাও আছে। কী দারুণ গলা ছিল স্কুলে পড়তে। এখনও কি একই রকম আছে? কাকিমাও তো ভালো গান করতেন। এসব ভাবতে ভাবতেই সাউন্ডবক্সে ক্যারাওকের সাথে ভেসে আসে “জীবন কে দিন … ঝুটে সহি… হাম ভি বডে দিলওয়ালে …”। এই তো সেই সাগর। আহা, সেই মনমাতানো গলা! আজও এক্কেবারে একই রকম। এটারই তো দরকার ছিল। 

reunion 10

আমাদের আড্ডা এক্কেবারে ষোলাআনা জমজমাটি। তারপর একের পর মন মাতানো গান। “ইয়ে জো মহব্বত হ্যায়”, “তুম হি হো”… তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেল সাগরের গলায়, “এই তো জীবন…” গানটা। সবাই মিলে একসাথে গেয়ে ওঠে ওরা। সবার মনের ভিতের তখন যেন বাঙালির সেই নায়ক উত্তম বাবু। শুভর মনে হচ্ছিল, উফ, আজ সময়টা যেন এখানেই থমকে যায়। সবাই মিলে একের পর এক বাংলা হিন্দি জীবনমুখী গান গেয়ে মজা করে এক অনবদ্দ সন্ধ্যা কাটাল ওরা।

reunion 12

এবার বোঝা যাচ্ছে তো, সারা বছর ধরে এই দিনটার জন্য ওদের সবার কীসের তাগিদে এত অধীর অপেক্ষা! কিন্তু সময় তো বয়ে চলেছে। এ যেন এক্কেবারে বাঙালির দুর্গা পূজার মতো। আসছে আসছে ব্যাপারটাই ভালো। চলে এলেই শেষ। ওদেরও প্রথমদিন প্রায় শেষ। হাতে আর মাত্র একটা দিন। এসব ভাবতে ভাবতে রাতের খাবার সেরে এই অমূল্য সময়টা যাতে ফসকে না যায় তাই সেটাকে জাপটে ধরে মাঝরাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে সবাই আজকের মতো ঘুমাতে যায়। কিছুক্ষণ পরেই উঠতে হবে যে। আবার সবার সাথে দেখা হবে আগামীকাল সকালে…

ক্রমশ…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top