“ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন”। উঁহু, মানতে পারলাম না। ভালো কিছু ঘটলে বেশী ভাবতে হয় না, কিন্তু উল্টোটা? প্রথমটায় তো উনি মঙ্গলটুকুই করলেন, বাকি কৃতিত্ব তো আমার। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেটার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় “কেন করলেন”। অমঙ্গলের দায় তো আমার নয়। পুরোটাই ওনার গণনার ভুল!
পরীক্ষা আমার, কিন্তু পাশ করানোর দায়িত্ব তো ওনার। পাশ করার পর আর ওনার খবর কে রাখে? আমার কঠোর অধ্যাবসায়-ই তো এই সাফল্যের চাবিকাঠি।
সারা বছর মা তার পরিবার সহ কেমন আছেন, সে খবর নাও না কখনো, আর ওই পাঁচ দিন ওনার নাম ভাঙিয়ে কি না কর। ওনাকে প্রণাম করতে গিয়েও সেল্ফি! :-O সেজেগুজে বন্ধুদের সাথে নিখাদ আড্ডায় মাতো! বাড়ির সকল কঠোর বাঁধন থেকে মুক্তি পেয়ে জীবনের অতৃপ্তি গুলিকে তৃপ্ত করতে উদ্যত হও! সকলের চোখের আড়ালে সেই বিশেষ মানুষটির সাথে ঘনিষ্ঠ কিছু মূহুর্তের অনুভূতি আগলে রাখো! একবারও তাঁকে তাঁর প্রাপ্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছো? একবারও হাসিমুখে বলেছো “thanks” বা আধুনিক আদবে “মা, you rock”? অথচ সারা বছর সবাইকে free তে thanks বিলিয়ে বেড়াচ্ছো। আচ্ছা এবার তুমিই বলো, তুমি ওনার জায়গায় থাকলে কি করতে? মঙ্গল? 😉
শনিবার রিক্সা স্ট্যান্ডের পাশে রাখা ওনার মূর্তিকে দূর থেকে এক আঙুল কপালে তুলে সেলুট ঠুকলে কি উনি খুশি হন? নাকি টাকা ভর্তি ব্যাগ থেকে অনেক খুঁজে এক টাকার একটা কয়েন বের করে তা অবলীলায় ওনার দিকে ছুঁড়ে মারলে কখনো আনন্দ পেতে পারেন? তার উপর নিজেকে diet এ রেখে Gym করে, high cholesterol আর sugar যুক্ত খাবার যুগ যুগ ধরে ওনাকে পরিবেশন করলে কি উনি কখনো মঙ্গল করার mood এ থাকবেন? 😉 সর্বদা স্বীকার করছি উনিই সর্ব শক্তিমান, অথচ ওনারই আদব-কায়দার উপর নিজেদেরই ইচ্ছে চাপিয়ে দিচ্ছি। ওনাকে নিজের দুর্বলতা আড়ালের ঢালে পরিণত করেছি। নিজের করা ভুল কাজের অংশীদার বানাতেও পিছপা হই না। আমরা তো নিজেদের ভুল গুলোকে ওনারই ইচ্ছা বলে পাড় পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। এতো কিছুর পরেও সেই সর্ব শক্তিমান আমাদের মঙ্গল করে চলেছেন এটাই বেশি নয় কি? তাতেও তার হিসেব চাইছো। তোমাদের স্পর্ধা দেখে তো তাজ্জব বনে যাওয়ার জোগাড়!
ওনাকে তো আমাদের ঘরেরই সদস্য হিসাবেই গন্য করো। তা সত্বেও এত ভয় কেন? শুধু চাইলেই হবে? ওনার কাছে পৌঁছাতেও তো হবে! উনি তো তোমাকে ভয় দেখান না। তাহলে? আসলে ভয় তো আমরা দেখাই। পাপ আর পুণ্যের মাঝের সীমারেখা তো আমাদেরই নির্ধারণ করা। তাহলে ওনার কৃতিত্ব কোথায়? সেটাই তো উপলব্ধি করতে হবে।
আমাদের স্কুলে ধর্ম নিয়ে ক্লাস হতো। রীতিমত পরীক্ষাও হতো। আমাদের ধর্মান্ধ করা বা ধর্মগুরু বানানোর জন্য নয়, বরং কুসংস্কার ও সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য করতে শেখার জন্য। আর সেখানেই রাজযোগ বিষয়টি আমাকে খুব আকর্ষণ করত। এবং তা নিয়ে সেই সময়ে মহারাজদের সঙ্গে বেশ কিছু নিবিড় আলোচনাও হয়েছে। ব্যাপারটা অনেকটা Abstruct Algebra র মত। গণিতে n th dimension এর মত নিরাকার পরম ব্রহ্মর অস্তিত্ব কল্পনা করতে হয়। ব্যাপারটা সহজ নয়! বিজ্ঞান যখন ব্যাখ্যা করতে পারে না সেখানেই তো দর্শনের স্থান। আর ধর্ম আর দর্শন যে আলাদা নয় তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না, তাই না? সেখানেই বুঝেছি, ধর্ম মেনো কিন্তু ধর্মান্ধ হয়োনা।
কাজেই তাঁর অস্তিত্ব নিয়ে তর্ক না করে বা ভুয়ো কিছু কঠিন ও অবৈজ্ঞানিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন আচারে নিজেকে আবদ্ধ করে বড় ভক্ত হিসাবে প্রতিপন্ন না করে নিজের মনে ওনাকে প্রতিষ্ঠা করো। নিজ লক্ষে স্থির হয়ে তা পূরণের জন্য অদম্য ইচ্ছাশক্তির দ্বারা সততার সাথে এগিয়ে চলো আর ওনার থেকে সেই পথে যাতে কোন বাহ্যিক শক্তির প্ররোচনায় বিচলিত না হয়ে পরো, তার বিশ্বাস অর্জন করে নাও। ব্যাস তাহলেই দেখবে আর ওই সস্তা আচারের কোন প্রয়োজন নেই এবং সেই সঙ্গে উপলব্ধিও করবে যে “ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন”!!!


