একবার ভাবলাম ইংরাজীতে লিখি, হয়তো সেটা সহজও হতো। তবে বাংলায় মনের ভাবনা প্রকাশে এখনো আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। যদিও এখন পেশাদারী দুনিয়ায় অনেক বেশি ইংরাজী ব্যাবহার করতে হয়, কিন্তু এই লেখাটার ক্ষেত্রে প্রবল যুক্তাক্ষর এবং অনুবাদের চাপ থাকলেও বাংলাই বেছে নিলাম।
নব্বই-এর দশক এবং তার আগে একটা সময় ছিল যখন আমরা তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়া সম্পর্কে খুব কম অবগত ছিলাম। ধারণা ছিল একটাই! বেসরকারি চাকরি, প্রচুর মাইনে এবং কাজের সূত্রে বিদেশে পাড়ি। “ভালো রোজগার করলেও, দাদা চাকরিটা কিন্তু নিরাপদ নয়”। এই ভাবনায় তৎকালীন মেয়েদের জন্য মধ্যবিত্ত বাড়ির লোকজনও সরকারী কর্মচারীকেই পাত্র হিসাবে অগ্রাধিকার দিতেন। তবে আজও যে তার বিশেষ পরিবর্তন হয়েছে তা নয়। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে তখনো কম্পুটার তেমন কৌলীন্য পায়নি। সাধারণ লোকে শুধু মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল বা সিভিল-ই বুঝতো। হয়তো বঙ্গবাসী হিসাবে আমরা এই চিন্তাধারায় একটু বেশিই পিছিয়ে ছিলাম।
তবে বাঙ্গালী মননের নবজাগরণ ঘটতে বেশি সময় লাগেনি। একবিংশ শতাব্দীর একটু আগে থেকেই নবজাগরণের আঁচ পাওয়া গেলো এবং সময়ের সাথে সাথে তা এতোই প্রবল হয়ে উঠলো যে কম্পুটার ইঞ্জিনিয়ারিংই তার কাছে হয়ে উঠলো সাফল্যের মাপকাঠি। আর ওই বেসরকারি চাকরিই হল পদমর্যাদার প্রতীক। সে যাই হোক, তা আপনি কি জানেন তথ্যপ্রযুক্তি আগামী দিনে কোন দিকে চলেছে? দুনিয়ার অনেক ভূয়সী পরিবর্তন তো আমরা দেখলাম গত বেশ কয়েক দশকে। অনেক অবিশ্বাস্য কল্পনাও বাস্তব হতে দেখেছি। ভাবলে চমকে যেতে হয়, তাইনা? আমি তো নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে করি এই মানব সভ্যতার অগ্রগতির সাক্ষী হতে পেরে। আপনার মনে হয়না? নাকি এভাবে কখনো ভাবেননি? যদি না ভেবে থাকেন তাহলে ভাবুন। অদূর ভবিষ্যতে প্রযুক্তির দুনিয়ায় যা ঘটতে চলেছে তাকে স্বাগত জানাতে হবে তো? নাকি আপনিও ওদের মত দুনিয়াটা গোল্লায় যাচ্ছে, আমাদের সময়েই সব ভালো ছিল বলে সবকিছু এড়িয়ে গিয়ে সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পিছিয়ে পড়বেন?
এখন তথ্যপ্রযুক্তির আঙ্গিনায় বরাবরই কিছু ভারী শব্দ ঘোরাফেরা করে, যেগুলি বাজারের প্রবণতার উপর নির্ভরশীল। বর্তমানের সেরকমই কিছু শব্দ হল “কল্পনা (idea)“, “উদ্ভাবন (Innovation)” এবং “স্বয়ংক্রিয়তা (automation)“. কিন্তু এই শব্দ গুলির তাৎপর্য কি?
এটা কি আকাশকুসুম কল্পনা? হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, আকাশকুসুমই বটে তবে বিজ্ঞান সম্যত। কিন্তু আগে সেটা ভাবতে হবে। হলিউডের সব সফল কল্পবিজ্ঞানের ছবিই তো আকাশ কুসুম কল্পনারই ফল। ও আপনি ওসব দেখেননা? পছন্দও করেননা! ও তো কেবলই মারামারি আর নয়তো কিছু কু-দৃশ্য, যা দেখেই তো সমাজটা গোল্লায় গেলো। তাই নিজ সন্তান হলিউডের দেশে থাকে বলে গর্ববোধ করেন আর নিজ সংস্কৃতি বজায় রাখতে শুধু বাংলা সিরিয়াল দেখেন বুঝি? ও এখন আবার সেটা মোবাইলে দেখেন! বাঃ এইতো প্রযুক্তিকে আপন করে নিয়েছেন দেখছি। তবুও বলবেন যে আগেই সব ভালো ছিল? যখন সব ভালো ছিল তখন কি মোবাইলের মত কিছু হতে পারে বলে আকাশকুসুম ভেবেছিলেন? ইন্টারনেটের মত একটি অদৃশ্য যোগাযোগ জাল ছাড়া যে রোজকার জীবন কাটানো অসম্ভব তা ভেবেছিলেন? ভাবেননি! তখন হলিউডের কল্পবিজ্ঞানের ছবি দেখলে হয়তো ভাবতে পারতেন। তা আপনার ছেলে মেয়ে বাইরে থাকলে ওদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করেনা? আপনার ছোট্ট নাতি-নাতনি কে দেখতে ইচ্ছে করেনা? কি করেন তখন? স্কাইপ! হোয়াট্স অ্যাপ! ফেসবুক! ম্যাসেঞ্জার! কখনো ভেবেছিলেন এভাবে পুরো দুনিয়াটা একদিন আপনার মুঠোয় চলে আসবে? তাহলে এই নতুন প্রজন্মকে গালমন্দ করলেও আপনি এই প্রযুক্তির উদ্ভাবন গুলিকে বেশ ব্যাবহার করেন। ব্যাবহার কি করেন, বলুন আপনি এগুলি ছাড়া চলতে পারেন না। আপনি এখন এগুলির উপর নির্ভরশীল।
তাহলে যেটা কাল আকাশকুসুম ছিল, সেটাই আজ বাস্তব হয়ে গেল! এটাই তো উদ্ভাবন (Innovation)। তবে এই আকাশকুসুম কল্পনাটা কিন্তু চাই! তা না হলে পরেরটার কোনো অস্তিত্বই নেই। একটু ভেবে দেখুন, আজ পর্যন্ত সমস্ত উদ্ভাবনই আকাশকুসুম কল্পনারই ফল! একটু ভাবুন না। আমি বলছি ভালো লাগবে।
সবই তো বুঝলাম, কিন্তু এই স্বয়ংক্রিয়তা (automation) টা কি? এ কি আমাদের কোনো কাজে লাগে? এ কি বলছেন! এতো আমাদের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত মশাই! প্রতিনিয়ত ব্যাবহার করছেন! আচ্ছা বলুনতো আপনি শেষ কবে ব্যাঙ্কে গিয়ে লাইন দিয়ে টাকা তুলেছেন? মনে পড়ছেনা তো? পড়বেওনা, কারণ আপনি তো বেশ কয়েক বছর ধরে এ টি এম নামক যন্ত্র থেকেই টাকা তোলেন। এটাই তো স্বয়ংক্রিয়তা! কেমন সুন্দর আপনার অ্যাকাউন্টে জমা টাকা যন্ত্রের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় ভাবে বেড়িয়ে আসে। এক পয়সাও বেশি বা কম নয়। আবার আপনার অ্যাকাউন্টে কত রইল তাও জানিয়ে দেয় প্রিন্ট করে ও সঙ্গে একটা এস এম এস ও পাঠিয়ে দেয়। আর আমরা এই পুরো ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কোথাও কোনো ভুল হতে পারে তা কল্পনাও করতে পারিনা। এবার বুঝলেন স্বয়ংক্রিয়তা খায় না মাথায় দেয়? 😛
এতো গেলো বর্তমান। ভবিষ্যতে এমন আর কি কি হতে চলেছে? ভাবুন ভাবুন। আকাশকুসুম ভাবুন। না ভাবলে হবে কেমন করে? বেশ আমি সাহায্য করছি।
যার ডায়াবেটিস আছে, তাকে তো কড়া নিয়ম মেনে ডাক্তারের পরামর্শ মত ইনসুলিন নামক হরমোন নিতে হয়? ওইতো, পাশের বাড়ির টোটার বাবাকেই তো নিতে হয়। ওর মা-ই তো বলছিলো সব সময় ওষুধ মজুত রাখতে হয় এবং কড়া নজরদারীও লাগে পাছে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে না যায়। তবে যদি এমন কোন যন্ত্রের ব্যাবস্থা করা যায় যে নিজেই রক্তে শর্করার মাত্রার উপর নজরদারি চালিয়ে যাবে এবং দরকার মত তার মধ্যে মজুদ ইনসুলিন থেকে পরিমাণ মত সময় করে টোটার বাবার শরীরে ইঞ্জেক্ট করে দেবে। আর মজুত ইনসুলিনের পরিমাণ কমে আসলে আগাম সতর্কটা দিয়ে দেবে, ইমেল বা এস এমএস করে! আরও ভালো হয় যদি সে একেবারে দোকানে অর্ডার দিয়ে দেয় ও ডাক্তারকেও নিয়মিত বিবরণ পাঠাতে থাকে। এ আবার কি! এরকম আবার সম্ভব নাকি! আমি, একজন পেশাদার স্বয়ংক্রিয়তা-পরামর্শদাতা বলছি, এটা সম্ভব। আর কয়েক বছর অপেক্ষা করুন। এটাও আপনার কাছে আজকের এ টি এম এর মত হয়ে যাবে।
আরও আছে। বাড়িতে পানীয় জল পরিশোধনের যন্ত্র আছে নিশ্চই। কেমন হয় যদি সে নিজে থেকেই নিজের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্থায় যোগাযোগ করে নেয় আর আপনার বোঝার আগেই সার্ভিসের লোক চলে আসে? আচ্ছা যদি এমন ফ্রিজ হয় যে আপনার মজুদ খাবার কমে গেলে নিজে থেকেই দোকানে জানিয়ে দেবে! বা আপনার মিষ্টি খাওয়া বারণ থাকলে আপনার জন্য ওই তাকটা খুলবেই না! যদি আপনার শীততাপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্রটি আপনার রোজকার অভ্যেস লক্ষ্য করে নিজে থেকেই তাপমাত্রা পরিবর্তন করতে থাকে। আপনি যদি অফিসে বসেই নিজের ঘরটি অতিথিদের জন্য খুলে দিতে পারেন! আবার তাদের উপর নজরও রাখতে পারেন!
হতেই পারে না! এতো অবিশ্বাস্য! না, ভুল করছেন, এটাই কল্পনা যেটা বাস্তব হতে চলেছে খুব তাড়াতাড়ি। তখন এটাই আপনার অভ্যেস হয়ে পরবে, ঠিক আজকের এ টি এম এর মত। এটাতো নিশ্চই জানেন যে ফেসবুক তাদের দুটি রোবোট বন্ধ করে দিতে বাদ্ধ হয়েছে কারণ তারা ইংরাজী ছেড়ে তাদের তৈরি নিজেদের ভাষায় যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছিল যা মানুষের বোধগম্য ছিলনা। কি কল্পবিজ্ঞান সত্যি হচ্ছে মনে হচ্ছে? হ্যাঁ একদম ঠিক, আমরা ওই দিকেই এগিয়ে চলেছি। তবে হ্যাঁ, সাবধান হতে হবে যাতে আমরা যন্ত্রের দাস না হয়ে পড়ি। খারাপটা না ভেবে বরং ভালো দিকটা ভেবে এগিয়ে চলুন। সব নতুন প্রযুক্তিই বাজে বলে দূরে সরিয়ে না দিয়ে নিজবুদ্ধিতে ভেবে দেখুন সেটা সত্যিই দূরে সরানোর মত কিনা। অতীতের থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলুন আর নতুন প্রজন্মকেও এগিয়ে দিন পরের ধাপে ঠিক যেভাবে আপনাকে এগিয়ে দিয়েছিল আপনার বরিষ্ঠরা। সকল প্রজন্মকেই নিজ গুণে এগিয়ে যেতে হয়, ভেবে দেখুন আপনিও তাই করেছেন। শুধু আপনার অভিজ্ঞতাকে হস্তান্তর করে দিন নতুনের হাতে এবং অনুভব করুন যে আপনিও এগিয়ে যাচ্ছেন সময়ের সাথে আর জায়গা করে নিচ্ছেন সকলের মনের অন্তরে!!!


