এক এ চন্দ্র, দুই এ পক্ষ, তিন এ নেত্র, চার এ বেদ… বাঙ্গালি বাড়ির শিক্ষার শুরুটা এই ছড়া দিয়েই হয়। মহালয়া পরবর্তী পক্ষে ত্রিনয়নী মায়ের পূজা বৈদিক মতে। আজ মহাষ্টমীর সকাল। সকালে চোখ খুলতেই পাড়ার মোড়ে মোড়ে লাগানো চোঙায় পিলে চমকে দেওয়া তারস্বরে অষ্টমী পূজার পুষ্পাঞ্জলীর ঘোষণা শুনতে পেলাম। প্রতিবারের মত অষ্টমীর দিন জলখাবারে লুচি আর আলুর দম খেতে খেতে জানালা দিয়ে দেখলাম পাড়ার মা কাকিমা বৌদি রা শাড়ি পরে হাতে পুষ্পাঞ্জলীর থালা নিয়ে চলেছেন। কিছুক্ষণ পরেই শুরু হল পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ। আমি সংস্কৃতে কোন দিনই পন্ডিত ছিলাম না, কিন্তু আমার ওই সামান্য জ্ঞানেই পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ যে ভুল তা উপলব্ধি করলাম। আর ফুল বেলপাতা মুঠো করে করজোরে চোখ বন্ধ করে সেই ভুল মন্ত্রই পুনরাবৃত্তি করে সকলে ছুঁড়ে মারছে মায়ের পায়ে। এখানেই শেষ নয়। এর মাঝেই পাড়ার সুন্দরী বৌদি তার পাশের বৌদিকে চোখ দিয়ে মেপে নিয়ে দাদাকে ধমকালেন, পল্টু আড়চোখে পুঁটিকে ঝাড়ি মেরে নিল, কেউ আবার তার মেয়ে বন্ধুর অঞ্জলী দেওয়ার ভঙ্গি মোবাইলে বন্দি করতে ব্যাস্ত। এত কিছু স্বত্বেও মায়ের কিন্তু মূর্তি-স্বরূপ দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। তিনি তাঁর বাপের বাড়ির লোকের এহেন ভক্তি যে বছরের পর বছর উপেক্ষাই করে আসছেন! অন্য কোন বাঙালি হলে এতদিনে কিছু না হোক, দু-চারটে মিটিং মিছিল করেই ফেলতেন!!!
দেবীর বোধন ষষ্ঠীর দিন। আমি তো জানতাম ওই দিনই পূজার শুরু। কিন্তু বানিজ্যিক কারণে গত কয়েক বছর ধরে দেখছি সব পূজারই উদ্বোধন হয়ে যাচ্ছে তৃতীয়ার দিনই। আর সে উদ্বোধন কি যে সে উদ্বোধন! Celebrity ছাড়া যে উদ্বোধন কৌলীন্যই পায়না! যে পাড়ার দাদা যত বড়, সে পাড়ার পূজা উদ্বোধনে তত বড় celebrity। সে যাই হোক, সব কিছুর বাণিজ্যিকরণ আর রাজনৈতিকরণ তো আমরা করেই থাকি। আসল উদ্দেশ্য তো ক্ষমতা জাহির করা। উদ্বোধন তো হয়ে গেল, এবার? প্রচন্ড বুদ্ধিমানের মত আপামর বাঙালি রাস্তায়। মা এসে পৌঁছলেনই না, অথচ তাকে দেখতে ভিড় লেগে গেল মন্ডপে মন্ডপে! আর তার ফল স্বরূপ, বাংলা খবরের চ্যানেল থেকে খবর উধাও! আর ফেসবুক ভরে গেল শুধুই রং মাখা face এ। তাই ঠিক করলাম এবার পূজায় শুধু ঘরে বসে খবর আর ফেসবুক follow করবো! এবং হলফ করে বলছি দাদা, আমার ভাবনা একেবারে সুপার হিট! এই দুই দিনেই প্রায় গোটা বঙ্গ তো বটেই, বাইরেরও ঠাকুর দর্শন হয়ে গেছে!
অষ্টমীর দিন দুপুরে আপামর বাঙালি যা যা খায়, আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। গলা পর্যন্ত ঠেসে ভরে এবার একটু দিবানিদ্রা হলে মন্দ হয়না। বিকেলে উঠে ভাববো যে বাকি দুই দিন কি করা যায়। আজ আবার বিধি বাম। আকাশে যে মেঘের ঘনঘটা। আজ তো তাহলে খবর আর ছবির update এর ধারাটা একটু আলাদা হবে। খুব ইচ্ছে করছে নিজেও কিছু update দেই। দেখি আজ একটা night out মারা যায় কিনা। ল্যাদে ভরা লোকজনকে ধরে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করি। তোমরাও আরও আরও মজা করো, আর বাকি দুদিনে আগামি এক বছর অপেক্ষার রসদ জোগাড় করে নাও…


