মহাসপ্তমী

Sheuli
আজ শহরের চারিদিকে কত ভিড়, সাজগোজ, আলোর রোশনাই। তবে আমার ছোটবেলার দুর্গা পূজার স্মৃতি ও আনুভুতি একটু অন্যরকম। পাড়ার মন্ডপে হাল্কা ভিড়, ঢাকের আওয়াজ আর তার তালে তালে কাশফুল কাঁধে ঢাকিদের নাচ, ঝিকিমিকি নক্সা করা চলমান আলো, সাথে মিশে থাকা রবীন্দ্র সঙ্গীত, কিশোর লতা আশা আরতির বাংলা গান। পূজা মানেই পূজাসংখ্যা, নতুন গানের ক্যাসেট, বাড়িতে রসিয়ে রান্নাবান্না, কব্জি ডুবিয়ে সবাই একসাথে খাওয়া, নতুন জামা, পরিবারের সবার সাথে আড্ডা মজা, সেজেগুজে একসাথে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া, সন্ধ্যায় ছোট বড় সবাই মিলে মন্ডপে মন্ডপে সাবেকি ঠাকুর দেখতে যাওয়া ইত্যাদি। মন্ডপে কত্ত লোকের সাথে দেখা, কথাবার্তা, ফুচকা, ফিস ফ্রাই, রোল-মোগলাই আরও কত্ত কি। সব মিলিয়ে চারিদিকে একটা অদ্ভুত সুন্দর পূজার গন্ধ। আজও হয়তো সবই আছে, কিন্তু পূজার মজার সেই প্রাণ আর ছোটবেলার সেই পূজার আবহটা যেন হারিয়ে গেছে। তবে আজকের গল্পের সাথে এসবের কোন সম্পর্ক নাই। আসলে দুর্গা পূজার দিনগুলি এলেই ছোটবেলার সেই দিনের আবহের কথা মনে পড়ে যায়।
আজ মহাসপ্তমী। আমাদের বাড়ির চারপাশে তিনটি মন্ডপ। পূজার এই কটাদিন চারিদিক দারুণ জমজমাট হয়ে ওঠে। সকালে জলখাবার সেরে একটু পাড়ায় বেরিয়েছি। চারিদিকে মাইকে ঢাক বাজছে। শুনে তো মনে হচ্ছে রেকর্ড বাজছে। সে যাই হোক, বাজছে তো! ঢাকের আওয়াজ ছাড়া কি পূজা হয় নাকি। কিছুদূর এগোতেই বুঝলাম সপ্তমী পূজা শুরু হয়েছে। মাইকে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ ভেসে এলো। পাড়ায় হাঁটতে হাঁটতে একটু মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম। পূজার মন্ত্রের একটা বিশেষ সুর আছে। সেই সুরেই মন্ত্র চলছে, তবে বিশ্বাস করুন, ওঁ আর নমো এই দুটি শব্দ ছাড়া কিচ্ছুটি বুঝতে পারলাম না। শুনতে ঠিক এরকম লাগছে, ওঁ হিজিবিজি নমোওও… সংস্কৃত ভাল বুঝিনা ঠিকই, কিন্ত আমাদের স্কুলে সংস্কৃতে প্রার্থনা হত আর তার উচ্চারণ ও অর্থ আত্মস্থ না হওয়া পর্যন্ত কেউ ছাড় পেত না। আর তখন আমাদের টাউনশিপের পূজায় তো পুরোহিত প্রতি লাইনে মন্ত্রের অর্থ বুঝিয়ে বলতেন। আজও আমাদের মত বাঙ্গালী পরিবারে বেশ কিছু মন্ত্র আমরা সবাই জানি। আমি আবার মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম। ভাল করে শুনে বুঝলাম যে পুরোহিতের কাছে মন্ত্রের উচ্চারণের মাহাত্ম্য থেকেও তার ছন্দটাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ধরুন
ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণী নমোহস্তুতে।।
মন্ত্রের সুর ও তালে জোর দিতে গিয়ে এটাই হয়ে যাচ্ছে
ওঁ সর্বমঙ্গলা,
মঙ্গল্যেশিবে,
সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে,
ত্র্যম্বকেগৌরি,
নারায়ণী,
নমোহস্তুতে।।
একটু বিরক্ত হয়েই দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলাম মন্ডপের দিকে। ঢুকে দেখি সবাই এবিষয়ে একেবারেই নির্বিকার। বরং একদল Gen-Z সেলফি তুলে পূজা ভাইবস টাইপের স্ট্যাটাস দিতে ব্যাস্ত, উল্টোদিকে কয়েকজন বয়স্কা চোখ বন্ধ করে করজোরে ভক্তি ভরে তালে তালে দুলে দুলে মনে মনে ওই মন্ত্রই বলে চলেছেন। এদিক ওদিক চাইতেই দেখি পাশে এক ভদ্রলোক করজোরে মন্ত্র বলতে বলতেই চোখের ইশারায় মন্ডপের এক কোণায় একটা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বলছেন। আমিও মুচকি হেসে চোখের ইশারায় তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বোঝালাম যে এদিকে মন না দিয়ে বরং আপনি যেটা করছেন সেটা চালিয়ে যান।
সব দেখে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে স্টেজের উপর মায়ের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, সেও হয়তো এরকম ভাবে বাপের বাড়ির আপ্যায়ন চায়নি। সে যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে বলতে চাইছে, এই দেখ তোদের অশিক্ষা আর লোক দেখানো ভক্তির কত জোর। কত সহজেই চারিপাশে মানুষকে কোন প্রতিরোধ ছাড়াই ভুল জিনিস শেখানো যায়।
কিছু করতে না পেরে মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে উপলব্ধি করলাম সত্যিই আমার ছোটবেলার থেকে এখনকার দুর্গা পূজা অনেক বদলে গেছে। সময়ের সাথে এগিয়ে এখন বাঙ্গালীর এই শ্রেষ্ঠ উৎসবে অনেক বেশী আড়ম্বর আর জৌলুশ থাকলেও আবেগ, আবহ ও অনুভুতির ফারাক হয়ে গেছে অনেকটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top