ইতিহাস যে কতটা শক্তিশালী তা উপলব্ধি করতে গেলে সঠিক ইতিহাস জানাটা খুবই জরুরী। একটা জাতির স্বাভিমান, অহংকার, শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে তার ইতিহাসে। আধুনিক পঠনপাঠনে সঠিক জ্ঞান অর্জনের তুলনায় বরং অধিক নম্বর পাওয়ার উপর জোর বেশি দিয়ে অজান্তেই এক দক্ষ চাকুরে হওয়ার অদ্ভুত কৃত্রিম ইঁদুর দৌড়ে আমরা সবাই সামিল। দেশের ইতিহাসে গর্ববোধ তো দুরের কথা, বরং দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও আরও আধুনিক চাকুরিবৃত্তিই আমাদের কাছে অধিক গর্বের। সাধারণের চোখে আজকের সাফল্যের মাপকাঠিই যে কৃত্রিম সুখভোগ আর বিলাসিতা। ভুলতেই বসেছি আমাদের সমৃদ্ধ ভারতীয় ইতিহাস।
এত কথা কেন বলছি বলুন তো? গত সপ্তাহেই ঘুরে এলাম মহাবলীপুরম (মামল্লপুরম)। চাক্ষুশ করে এলাম ভারতীয় ইতিহাসের এক স্বর্ণযুগের। অবাক দৃষ্টে শুধু তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। নিমেষে চোখের সামনে যেন ফুটে উঠল সেই ইতিহাসের দিনগুলি! সবার অলক্ষেই আমাদের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠত্যের দিনের কথা ভেবে গর্ব আর অহংকার বোধ করলাম। সবই আজকের আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমাদের নখদর্পণে। এক অঙ্গুলিহেলনেই পর্দায় ভেসে ওঠে সব অজানা তথ্য। তবু একটু নিজের মত করেই আমাদের সেই স্বর্ণযুগের একটু গল্প বলি।
মহাবলীপুরম (মামল্লপুরম) ভারতের করমন্ডল উপকূলে (আজকের ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের পূর্ব উপকূল) অবস্থিত একটি শহর। ইতিহাসে আছে পল্লব শাসন কালে এই শহর হয়ে উঠেছিল দক্ষিণ ভারতের অন্যতম বর্ধিষ্ণু নৌ বানিজ্য শহর। কথিত আছে মল্ল যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ও অনুশীলন হত এই শহরে। পুরম শব্দের অর্থ বসতি। তা থেকেই এর নাম মামল্লপুরম। পল্লবরা রাজত্য করেছিল তৃতীয় শতাব্দী ২৯৭ থেকে নবম শতাব্দী ৮৯৭ পর্যন্ত। ১৯ তম পল্লব রাজা নরসিমাবর্মন ছিলেন তাঁর পিতা মহেন্দ্রবর্মনের মতই শিল্প কলা অনুরাগী। তিনিই তাঁর রাজত্ব কালে (৬৩০ থেকে ৬৬৮ খ্রীষ্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেন এই বিখ্যাত মহাবলিপুরমের উপকূল মন্দির (Shore temple)। কথিত আছে, এই সময়েই চীনা পরিব্রাজক হিউয়েনসাং কাঞ্চিপুরম পরিদর্শনে আসেন। এই সময়ে ভারতবর্ষ ছিল বিশ্যের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত শ্রেষ্ঠ রাজ্য। অনবদ্য শিক্ষা কাঠমো, মূল্যবান শাস্ত্রচর্চা, বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়, নিপুণ শিল্পকলা, আধুনিক কৃষি ও শিল্প পরিবেষ্টিত সমাজ, শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক কাঠামো, রপ্তানি বানিজ্যে প্রথম সারির পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ রাজ্য।
সেই সময়ে জলপথই ছিল আন্তর্জাতিক বানিজ্যের প্রধান উপায়। আর সেই পথ ছিল প্রাচীন সিল্ক রুটেরই অংশ। পাশ্চাত্যের নাবিকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে জলপথের মানচিত্র তৈরি করতেন, যা পর্তোলান চার্ট নামে পরিচিত ছিল। এগুলি আসলে জলপথের আনুমানিক মানচিত্র যেখানে নাবিকের জন্য স্থলভাগের বিশেষ স্থানের উল্লেখ থাকত ল্যান্ডমার্ক হিসাবে। চৌদ্দশ থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে এরকম পর্তোলান মানচিত্রে মহাবলীপুরমের এই মন্দিরের উল্লেখ মেলে সেভেন প্যাগোডা (সাতটি মন্দির) হিসাবে। সমৃদ্ধ পল্লব রাজত্যের এই জাঁকজমকপুর্ন মন্দিরের তামায় মোড়া চূড়া দূর থেকে সূর্যের আলোয় সোনার মত জ্বল জ্বল করত। আর এটা দেখেই দূরে সমুদ্রে নাবিকরা বুঝতে পারতেন যে তারা দক্ষিণ ভারতে পৌছে গেছে। এই সেভেন প্যাগোডাই আজকের উপকূল মন্দির (shore temple), পঞ্চরথ মন্দির আর লাইট হাউসের কাছে ভীমা মন্দির।
এবার আসি বানিজ্যে। ভারত থেকে পাশ্চাত্য বণিকের দল প্রধানত বহুমূল্য দিয়ে মশলা, এমব্রয়ডারি ও ছবি আঁকা করা কাপড়, প্রসাধনী আর চা নিয়ে যেত। মশলার মধ্যে গোলমরিচ ছিল অন্যতম, যার পাশ্চাত্যের রোমান সাম্রাজ্যে দারুন কদর ছিল। রোমে গোলমরিচ ছাড়া রাজকীয় সুস্বাদু খাবার ভাবাই যেত না। ভারত থেকে আমদানি করা জামা কাপড়ও ছিল পাশ্চাত্যের সাজগোজের শৈলীর অন্যতম প্রধান অঙ্গ। এমনও শোনা যায় যে সে সময়ে রোমান সাম্রাজ্যে ভারত থেকে সামগ্রী আমদানীতে তাদের রাজ ভাঁড়ারে এতটাই টান পরে যে তাদের এই আমদানীতে রাশ টানতে হয়েছিল।
এতটাই সমৃদ্ধ ছিল আমাদের দেশ, থুরি এতটাই সমৃদ্ধ আমার দেশ। এরকমই কত ইতিহাস ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। আবার দেখা হবে নতুন জায়গায় নতুন কিছু ইতিহাসের খুঁটিনাটি নিয়ে। শুধু একটাই অনুরোধ! যেখানেই থাকুন, গর্বের সাথে বলুন, স্বাভিমানের সাথে বলুন, অহংকারী হয়ে বলুন, আমি ভারতীয়।
